Comilla TV - The First online TV of Comilla

মিন্নি অসুস্থ বারবার রিফাতের ঘরে

কুমিল্লা.টিভি

প্রকাশিত : ০৫:২৯ পিএম, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৫:৩০ পিএম, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়ার পর জামিনে মুক্ত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। উন্নত চিকিৎসার জন্য মিন্নিকে

 

কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী ঢাকা অথবা বিভাগীয় শহর বরিশালে নিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান তারা। এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ৩৯ মিনিটে বরগুনা জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান মিন্নি। কারাফটক থেকে বের হয়ে বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি বরগুনা শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকার বাবার বাড়িতে চলে যান তিনি। হাইকোর্ট থেকে পাওয়া জামিনের শর্তানুযায়ী গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলতে পারবেন না মিন্নি।

গতকাল বুধবার বিকেলে তার বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা দলে দলে মিন্নির সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। তবে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলছে না তিনি। মনমরা হয়ে নিজের কক্ষের মধ্যেই বসে থাকছেন। তাকে দেখতে আসা কারও সঙ্গে এসে দেখা করা তো দূরের কথা, কারও সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলছেন না মিন্নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও খুব একটা খাওয়া-দাওয়া করছেন না তিনি। শুধু মিন্নি আর নিহত রিফাত এই বাড়িতে এলে যে কক্ষে থাকতেন সেখানে গিয়ে বারবার হাউমাউ করে কাঁদছেন।

মেয়ের সম্পর্কে জানতে চাইলে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মেয়েটির খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। একা একা থাকে, কারও সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলে না। বারবার ওর ছোট ভাই ও বোনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কখনো আবার রিফাতের রুমের পাশে গিয়ে কেঁদে ওঠে। দিন দিন মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাই খুব শিগগিরই ওকে ঢাকা অথবা বরিশাল নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করাব।’

রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো তার স্ত্রী মিন্নিকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালিয়েছিল বলে এর আগে তার সঙ্গে কারাগারে দেখা করার পর জানিয়েছিলেন আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। আর এই নির্যাতনের প্রভাবে মিন্নি অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলেও তখন জানিয়েছিলেন তিনি।

মোজাম্মেল বলেন, ‘আমার মেয়ে নিরপরাধ। তাকে জোর করে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার মেয়ে নির্দোষ, তাই তাকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছে। আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন পর আমাদের কাছে পেয়েছি, এটাই আমাদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো লাগছে। আমরা খুশি যে আমার মেয়েকে জামিনে মুক্ত করতে পেরেছি। রিফাত আমার ছেলের মতো ছিল, সে যাতে পরপারে ভালো থাকে তার জন্য বাড়িতে আজ দোয়া করিয়েছি।’

জামাই রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ তার ছেলের খুনিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এমনটা আক্ষেপ করে মোজাম্মেল বলেন, ‘শুধু একটাই খারাপ লাগছে, আমার ছেলের মতো জামাইটা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আর ওর খুনিদের সঙ্গে যোগসাজশে আমার মেয়েকে ফাঁসাতে মরিয়া হয়ে উঠছে আমার বেয়াই। ছেলের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে কীভাবে দুলাল শরীফ এভাবে করতে পারল আমি ভেবে পাই না।’

অন্যদিকে মিন্নির মা মিলি আক্তার , ‘আমার মেয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছে। আমি আর কিছুই চাই না। আমার মেয়েকে কতদিন দেখিনি। এবার দুই চোখ ভরে দেখব। আমার মেয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকানো যায় না।’

মিন্নির চাচা আবু সালেহ বলেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা মিন্নিকে ফাঁসিয়ে খুনিদের আড়াল করার যে পরিকল্পনা করেছিল মিন্নির জামিনে মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও তা লাগব হয়েছে। আমরা আশা করছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে রিফাতের সব হত্যাকারীকে আইনের আওতায় আনা হোক।’

গত ২৯ আগস্ট বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নির জামিন আদেশ দেয়। এর আগে গত ৮ আগস্ট মিন্নিকে সরাসরি জামিন না দিয়ে এ বিষয়ে রুল জারি করতে চাইলে আবেদনটি (জামিন) ফেরত নিয়েছিলেন তার আইনজীবী জেড আই খান পান্না। এরপর গত ১৮ আগস্ট বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চে জামিন আবেদন করেন মিন্নির আইনজীবীরা। ওই আবেদনের শুনানিকালে রিফাত হত্যা মামলায় তার স্ত্রী মিন্নিকে কবে ও কখন গ্রেপ্তার, আদালতে নেওয়া ও তার জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পুলিশ সুপার কবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সেসব তথ্য জানতে চায় হাইকোর্ট। পরে মিন্নির জামিন মঞ্জুর করে দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট বলে, জামিনকালে মিন্নি তার বাবার জিম্মায় থাকবেন এবং গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না। এই শর্ত ভঙ্গ হলে তার জামিন বাতিল হবে।

এদিকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষের ওই আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গত সোমবার চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ‘নো অর্ডার’ দিয়েছিলেন। চেম্বার বিচারপতির ওই আদেশের ফলে মিন্নিকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল থাকে।

এরও আগে গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে রিফাত শরীফকে তার স্ত্রী মিন্নির সামনে রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে ওইদিন বিকেলেই তার মৃত্যু হয়। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যার ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে দেখা যায় মিন্নিকে। রিফাত হত্যার পরদিন ২৭ জুন তার বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। এতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু মামলার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িতÑ এমন দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন তার শ্বশুর দুলাল শরীফ। এরপরই মামলার তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয়। সংবাদ সম্মেলনের পরদিন মিন্নির গ্রেপ্তার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশও করা হয়। ওই সমাবেশে দুলাল শরীফ ছাড়াও স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করে বক্তব্য দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদের নামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর থেকেই কারাগারে ছিলেন তিনি। কয়েক দফা আবেদন জানালেও নিম্ন আদালতে জামিন মেলেনি মিন্নির।

এই বিভাগের জনপ্রিয়